‘জ়’, ‘ফ়’, ‘খ়’— আনন্দবাজার পত্রিকার বানানে এই অদ্ভুত ফুটকি বা নুক্তার রহস্য কী?
আমরা যারা নিয়মিত আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ি, তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছি যে সেখানে ‘জিরো’ লেখা হয় ‘জ়িরো’, ‘ফটো’ লেখা হয় ‘ফ়টো’, কিংবা ‘খবর’ লেখা হয় ‘খ়বর’ হিসেবে। চেনা বাংলা অক্ষরের নিচে এই ছোট্ট ফোঁটা বা ফুটকি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— এই বর্ণগুলোর উৎপত্তি কোথা থেকে? আর কেনই বা একটি শতাব্দীপ্রাচীন সংবাদপত্র এই অদ্ভুত বানানরীতি দিনের পর দিন ব্যবহার করে চলেছে?
আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব এর পেছনের আকর্ষণীয় ইতিহাস, ভাষাতাত্ত্বিক কারণ এবং এর নেপথ্যের কারিগরদের নিয়ে।
🔹 নুক্তা বা ফুটকির উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য
ঐতিহ্যগত বাংলা वर्णমালায় আমাদের ‘জ’ এর উচ্চারণ সাধারণত ইংরেজি ‘J’ (যেমন: Job, Joy) এর মতো হয়। কিন্তু ইংরেজি ‘Z’ (যেমন: Zero, Zebra) কিংবা আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার বহু শব্দে আলাদা এক ধরণের শিস ধ্বনি বা কম্পিত উচ্চারণ থাকে, যা সাধারণ ‘জ’ দিয়ে হুবহু বোঝানো অসম্ভব।
এই সূক্ষ্ম উচ্চারণগত তফাত এবং আন্তর্জাতিক ধ্বনিবৈচিত্র্যকে বাংলা লিপির ফ্রেমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেই দেবনাগরী (হিন্দি) লিপির অনুকরণে বাংলা অক্ষরের নিচে এই বিন্দু বা ‘নুক্তা’ ব্যবহারের চল শুরু হয়।
🔹 কোন বর্ণটি কী উচ্চারণ নির্দেশ করে?
- জ় (Z): সাধারণ 'জ' নয়, ইংরেজি Z বা ফারসি ‘জ়াল/জ়ে’-র মতো কম্পিত উচ্চারণ (যেমন: জ়েব্রা, জ়িরো, হরমুজ়)।
- ফ় (F): দুই ঠোঁট স্পর্শ করে ফুঁ দেওয়ার মতো ‘ফ’ নয়, বরং ওপরের দাঁত ও নিচের ঠোঁট ছুঁয়ে ইংরেজি ‘F’ বা ফারসি ‘ফে’-র মতো উচ্চারণ (যেমন: ফ়িজিক্স, ফ়িল্ম, ফ়টো)।
- খ় (Kh/X): গলা খাকারি দিয়ে উচ্চারিত ফারসি বা উর্দু ‘খে’ ধ্বনি (যেমন: খ়ান, খ়বর, খ়ুশি)।
- ক় ও গ়: কণ্ঠনালীর গভীর থেকে উৎপাদিত বিশেষ আরবি ‘ক্বাফ’ ও ‘গাইন’ ধ্বনি প্রকাশের জন্য (যেমন: ক়োরআন, গ়জল)।
🔹 এই আন্দোলনের নেপথ্যে ছিলেন কারা?
এই বিশেষ বানান সংস্কার কোনো একক ব্যক্তির খেয়াল ছিল না। এর পেছনে জড়িয়ে আছে বাংলার দিকপাল পণ্ডিত ও ভাষাবিজ্ঞানীদের নাম:
১. রাজশেখর বসু (পরশুরাম): ১৯৩৫-৩৬ সালের কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ের ঐতিহাসিক ‘বানান সমিতি’-র সভাপতি হিসেবে তিনি তাঁর বিখ্যাত ‘চলন্তিকা’ অভিধানে এই নুক্তাযুক্ত প্রতিবর্ণীকরণের ধারাটিকে জোরালোভাবে প্রবর্তন করেন।
২. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: ভারতের এই মহান ভাষাবিজ্ঞানী বাংলা লিপির সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং বিদেশি শব্দের সঠিক আন্তর্জাতিক উচ্চারণ ধরে রাখতে এই পদ্ধতির ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেন।
৩. বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমর্থন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে প্রথাগত সংস্কৃত ঘেঁষা বানানের চেয়ে উচ্চারণের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ও সহজ বাংলা প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন এবং এই সংস্কারকে পূর্ণ সমর্থন জানান।
৪. आनন্দবাজারের দূরদর্শী সম্পাদকবৃন্দ: সুরেশচন্দ্র মজুমদার, প্রফুল্লকুমার সরকার এবং পরবর্তীতে অশোক কুমার সরকার ও সন্তোষকুমার ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা এই পুথিগত ব্যাকরণকে প্রতিদিনের খবরের কাগজে ব্যবহারের সাহস দেখান এবং পত্রিকার নিজস্ব ‘স্টাইল গাইড’ (Style Guide) তৈরি করেন।
২. ড. সুনীতিকুমার চট্টোপাধ্যায়: ভারতের এই মহান ভাষাবিজ্ঞানী বাংলা লিপির সীমাবদ্ধতা দূর করতে এবং বিদেশি শব্দের সঠিক আন্তর্জাতিক উচ্চারণ ধরে রাখতে এই পদ্ধতির ভাষাতাত্ত্বিক ভিত্তি তৈরি করেন।
৩. বিশ্বকবি রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের সমর্থন: রবীন্দ্রনাথ ঠাকুর নিজে প্রথাগত সংস্কৃত ঘেঁষা বানানের চেয়ে উচ্চারণের ওপর ভিত্তি করে আধুনিক ও সহজ বাংলা প্রবর্তনের পক্ষপাতী ছিলেন এবং এই সংস্কারকে পূর্ণ সমর্থন জানান।
৪. आनন্দবাজারের দূরদর্শী সম্পাদকবৃন্দ: সুরেশচন্দ্র মজুমদার, প্রফুল্লকুমার সরকার এবং পরবর্তীতে অশোক কুমার সরকার ও সন্তোষকুমার ঘোষের মতো ব্যক্তিত্বরা এই পুথিগত ব্যাকরণকে প্রতিদিনের খবরের কাগজে ব্যবহারের সাহস দেখান এবং পত্রিকার নিজস্ব ‘স্টাইল গাইড’ (Style Guide) তৈরি করেন।
🔹 কেন এটি আজও আমাদের জানা জরুরি?
বিশ্বায়নের এই যুগে বিদেশি ব্যক্তি, স্থান বা নতুন পরিভাষার নাম বাংলায় লেখার সময় যেন ভুল উচ্চারণ না হয়, সেটাই এই পদ্ধতির মূল লক্ষ্য। সাধারণ সর্বজনগ্রাহ্য বাংলা বর্ণমালায় এটি প্রাতিষ্ঠানিক রূপ না পেলেও, উচ্চারণের শুদ্ধতা ও ভাষার আধুনিকীকরণে এর কার্যকারিতা অনস্বীকার্য।
পরের বার যখন আনন্দবাজারের পাতায় বা কোথাও এই ফুটকিগুলো দেখবেন, জানবেন— এর পেছনে লুকিয়ে আছে বাংলা ভাষাকে আন্তর্জাতিক স্তরে নিখুঁত করার এক শতবর্ষ প্রাচীন লড়াই!
📢 আপনার মতামত জানান: আপনার কি এই নুক্তাযুক্ত বানানগুলো পড়তে ভালো লাগে, নাকি সাধারণ বানানই বেশি পছন্দ? কমেন্ট সেকশনে আপনার মতামত আমাদের সাথে শেয়ার করুন!
✨ আমাদের সাথে যুক্ত থাকুন:
👉 জয়েন করুন আমাদের #WhatsAppChannel-এ
👉 লাইক ও ফলো করুন আমাদের #FacebookPage
👉 জয়েন করুন আমাদের #WhatsAppChannel-এ
👉 লাইক ও ফলো করুন আমাদের #FacebookPage
🎒 এই ব্লগটি Edusmiths – Learn & Rise প্রকল্পের একটি অংশ, যা Imperial International School, Sherpur দ্বারা পরিচালিত।
ইতিহাস ও সাহিত্য, ভাষা, ভাষার ইতিহাস, বাংলা শিক্ষা, Edusmiths, Sherpur, Learning, Education, Anandabazar Patrika
মন্তব্যসমূহ
একটি মন্তব্য পোস্ট করুন