পোস্টগুলি

‘জ়’, ‘ফ়’, ‘খ়’— আনন্দবাজার পত্রিকার বানানে এই অদ্ভুত ফুটকি বা নুক্তার রহস্য কী?

ছবি
 আমরা যারা নিয়মিত আনন্দবাজার পত্রিকা পড়ি, তারা নিশ্চয়ই খেয়াল করেছি যে সেখানে ‘জিরো’ লেখা হয় ‘জ়িরো’, ‘ফটো’ লেখা হয় ‘ফ়টো’, কিংবা ‘খবর’ লেখা হয় ‘খ়বর’ হিসেবে। চেনা বাংলা অক্ষরের নিচে এই ছোট্ট ফোঁটা বা ফুটকি দেখে অনেকের মনেই প্রশ্ন জাগে— এই বর্ণগুলোর উৎপত্তি কোথা থেকে? আর কেনই বা একটি শতাব্দীপ্রাচীন সংবাদপত্র এই অদ্ভুত বানানরীতি দিনের পর দিন ব্যবহার করে চলেছে? আজকের ব্লগে আমরা আলোচনা করব এর পেছনের আকর্ষণীয় ইতিহাস, ভাষাতাত্ত্বিক কারণ এবং এর নেপথ্যের কারিগরদের নিয়ে। 🔹 নুক্তা বা ফুটকির উৎপত্তি ও উদ্দেশ্য ঐতিহ্যগত বাংলা वर्णমালায় আমাদের ‘জ’ এর উচ্চারণ সাধারণত ইংরেজি ‘J’ (যেমন: Job, Joy) এর মতো হয়। কিন্তু ইংরেজি ‘Z’ (যেমন: Zero, Zebra) কিংবা আরবি, ফারসি ও উর্দু ভাষার বহু শব্দে আলাদা এক ধরণের শিস ধ্বনি বা কম্পিত উচ্চারণ থাকে, যা সাধারণ ‘জ’ দিয়ে হুবহু বোঝানো অসম্ভব। এই সূক্ষ্ম উচ্চারণগত তফাত এবং আন্তর্জাতিক ধ্বনিবৈচিত্র্যকে বাংলা লিপির ফ্রেমে নিখুঁতভাবে ফুটিয়ে তুলতেই দেবনাগরী (হিন্দি) লিপির অনুকরণে বাংলা অক্ষরের নিচে এই বিন্দু বা ‘নুক্তা’ ব্যবহারের চল শুরু হয়। 🔹 কোন বর্ণটি কী...

সপ্তম শ্রেণি | ইতিহাস | চতুর্থ অধ্যায়: সুলতানী শাসন

ছবি
📚 সপ্তম শ্রেণি | ইতিহাস | চতুর্থ অধ্যায়: সুলতানী শাসন 🔟 দশটি পূর্ণাঙ্গ ৫ নম্বরের প্রশ্নোত্তর ❓ ৬. কুতুবউদ্দিন আইবক কে ছিলেন? তাঁর প্রধান কাজগুলো উল্লেখ করো। ✅ উত্তর: কুতুবউদ্দিন আইবক ছিলেন তুর্কি বংশোদ্ভূত এবং মোহাম্মদ ঘোরীর দাস ও সেনাপতি। ঘোরীর মৃত্যুর পর ১২০৬ খ্রিস্টাব্দে তিনি দিল্লির সুলতান হিসাবে সিংহাসনে বসেন। তাঁকে দিল্লির সুলতানী শাসনের প্রতিষ্ঠাতা হিসেবে ধরা হয়। 🔹 তিনি দিল্লি ও আজমীরকে রাজধানী করেন। 🔹 তাঁর শাসনকালে লাহোর ও দিল্লি শহর গড়ে ওঠে। 🔹 তিনি “লক্ষণবতী অভিযান” পরিচালনা করে বাংলার কিছু অংশ অধিকার করেন। 🔹 কুতুব মিনারের নির্মাণ কাজ তাঁর আমলে শুরু হয়। 🔹 তিনি দানশীলতার জন্য “লক্ষণবতীর খিরাত” বা “দীন-ইলাহী” উপাধি পান। 📌 উপসংহার: কুতুবউদ্দিন আইবক দিল্লির প্রথম স্বাধীন তুর্কি সুলতান হিসেবে রাজনৈতিক স্থিতি ও প্রশাসনিক ভিত্তি তৈরি করেছিলেন। ❓ ৭. ‘চাহালগানি’ কীভাবে দিল্লি সুলতানদের জন্য সমস্যা তৈরি করেছিল? ✅ উত্তর: চাহালগানি ছিল ৪০ জন তুর্কি অভিজাত আমিরের একটি পরামর্শদাতা গোষ্ঠী। যদিও ইলতুৎমিস এই দলটি গঠন করেছিলেন শাসন কাজে সাহায্যের জন্য, ...

"মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – প্রান্তিক ও মুসলিম সমাজের অবদান" পর্ব -৫

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – প্রান্তিক ও মুসলিম সমাজের অবদান ভূমিকা: বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ইতিহাসে “মধ্যযুগ” শব্দটি যেন একটি বিভাজক রেখা হয়ে দাঁড়িয়েছে। একপক্ষ একে সোনালি যুগ বলে অভিহিত করলেও অন্যপক্ষ একে ‘অন্ধকার যুগ’ বলে নিন্দিত করেছে। প্রশ্ন হলো—এই ‘অন্ধকার’ কার জন্য? কারা ছিল সেই যুগের আলোর বাহক? ইতিহাসের পুঙ্খানুপুঙ্খ বিশ্লেষণ করলে স্পষ্ট হয়, যাঁরা ‘অন্ধকার’ বলছেন, তাঁরা ভাষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির ধারাকে শুধু উচ্চবর্গীয় সংস্কৃত নির্ভর দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার করেছেন। বাস্তবে এই যুগেই প্রান্তিক জনগোষ্ঠী এবং বাংলার মুসলিম সমাজ বাংলা ভাষাকে গ্রামীণ স্তর থেকে সাহিত্যিক স্তরে তুলে এনেছেন। ১। সেন রাজবংশ ও বাংলাভাষার উপর অবদমন বাংলা সাহিত্যের এক গুরুত্বপূর্ণ বাঁক ছিল পাল ও সেন যুগ। পালরা যদিও বৌদ্ধ ছিলেন এবং তুলনামূলকভাবে উদারচেতা, সেনরা ছিলেন কট্টর হিন্দু। সেন রাজাদের মধ্যে বল্লাল সেন ও লক্ষ্মণ সেন বিশেষভাবে খ্যাত। বল্লাল সেন ‘বর্ণাশ্রম ধর্ম’ ও জাতপাত ব্যবস্থাকে কঠোরভাবে চালু করেন। এর ফলে বাংলাভাষার উপর চেপে বসে সংস্কৃত ভাষার একচ্ছত্র আধিপত্য। উচ্চবর্ণীয় ব্রাহ্মণ সমাজ ও রাজ...

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয়: কলঙ্কের আবরণে আড়াল হওয়া এক সুবর্ণ অধ্যায় (শেষ পর্ব)"

🔍 প্রস্তাবনা ‘মধ্যযুগ’ শব্দটি বাংলা সাহিত্যে উচ্চারিত হলেই তার সঙ্গে লেগে থাকে একধরনের অদৃশ্য অবজ্ঞা—এটা যেন কেবল ধর্মীয় কাব্য, দাসত্বে পরিণত ভাষা, এবং অন্ধকারে ডুবে থাকা সময়ের প্রতিনিধি। অথচ বাস্তব চিত্র সম্পূর্ণ আলাদা। আজকের আধুনিক বাংলা ভাষার ভিত যে জমিতে গড়ে উঠেছে, তা মূলত প্রান্তিক জনগণের মুখের ভাষা, মুসলমান কবিদের সরল অথচ দার্শনিক ভাবনার গীত, এবং জনগণের হৃদয়ে গাঁথা কথাসাহিত্য। এই সত্যকে বারবার উপেক্ষা করা হয়েছে তথাকথিত ‘অন্ধকার যুগ’ তত্ত্বে। 📌 মুসলমানদের অবদান – বিস্মৃত ইতিহাস বাংলা সাহিত্যর জন্ম ও বিবর্তনে মুসলমান কবিদের অবদান বহুদিন অবহেলিত থেকেছে। শেখ ফয়জুল্লাহ, সৈয়দ সুলতান, আফজল আলি, আবদুল হাকিম প্রমুখ কবিরা শুধু ধর্মকথা লেখেননি, তারা সমকালীন সমাজ, নৈতিকতা, ইতিহাস ও মানবিক চেতনার কথা বলেছিলেন। সৈয়দ সুলতান: চৈতন্যচরিত, নবীবংশের গীত এবং দর্শনচর্চা—তার লেখায় ইসলাম ও হিন্দু ঐতিহ্য মিলেমিশে গেছে। আবদুল হাকিম: তাঁর বিখ্যাত উক্তি—“যে জন বঙ্গেতে জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী, সে জন কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি”—আজও প্রাসঙ্গিক। তিনি বাংলা ভাষার মর্যাদা রক্ষায় বলিষ্ঠ কণ্ঠস্বর। এঁ...

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – পর্ব ৪ | মুসলমানদের অবদান ও সেন শাসনের ভাষানীতির বিশ্লেষণ

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – পর্ব ৪ মুসলমানদের অবদান, সেনদের অবজ্ঞা ও বাংলা ভাষার নিচু তলার প্রাণশক্তি বাংলা সাহিত্য ও ভাষার ইতিহাসে মধ্যযুগকে ‘অন্ধকার যুগ’ হিসেবে চিহ্নিত করা বহুদিনের অভ্যাস। তবে পূর্ববর্তী আলোচনায় আমরা দেখতে পেয়েছি, এই ধারণা একপাক্ষিক এবং অনেকাংশেই ভুল। এই পর্বে আমরা আলোচনার বিস্তার করব তিনটি গুরুত্বপূর্ণ দিক নিয়ে— ১. মধ্যযুগে মুসলমান শাসকদের ও সাধকদের বাংলা ভাষা ও সাহিত্যে অবদান ২. সেন শাসকদের আমলে বাংলা ভাষার প্রতি অবজ্ঞা ও অবদমন ৩. সাধারণ হিন্দু সমাজে বাংলা ভাষার চল এবং উচ্চবর্ণীয় হিন্দুদের দৃষ্টিভঙ্গি 📜 মুসলমানদের অবদান: একটি বাস্তবধর্মী বিশ্লেষণ ১২০৪ সালে বখতিয়ার খিলজি নদীয়া বিজয় করে বাংলায় মুসলিম শাসনের সূচনা করেন। এরপর প্রায় ৫০০ বছরের মুসলিম শাসন বাংলা ভাষা ও সাহিত্যের ওপর ব্যাপক প্রভাব ফেলেছিল। যদিও প্রশাসনিক ভাষা ছিল ফার্সি, তবু বাংলা ভাষার বিকাশ ঘটেছিল মূলত মসনদ ও সাধক সমাজের সমান্তরাল প্রভাবের ফলে। একটি গুরুত্বপূর্ণ নাম এখানে উঠে আসে—সুলতান গিয়াসউদ্দিন আজম শাহ। তিনিই প্রথম বাংলা কবিদের পৃষ্ঠপোষকতা করেছিলেন। কবি মুকুন্দরা...

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – পর্ব ৪ | লোকসাহিত্য, নারীচরিত্র ও প্রতিবাদের কণ্ঠস্বর

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – পর্ব ৪ 📚 পূর্ববর্তী পর্ব: তৃতীয় পর্ব পড়ুন বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে মধ্যযুগ প্রায়ই “অন্ধকার যুগ” নামে অভিহিত হয়েছে। তবে এই ধারনা অনেকটাই একপাক্ষিক। আমরা পূর্ববর্তী পর্বগুলিতে আলোচনা করেছি কিভাবে মঙ্গলকাব্য, বৈষ্ণবপদাবলী এবং অন্যান্য ধর্মীয় সাহিত্যে এই সময়ে বাংলা সাহিত্য রীতিমতো প্রাণবন্ত ছিল। এবার আমরা আরও গভীরভাবে বিশ্লেষণ করব—এই সময়ের সাহিত্য সমাজের চেতনাগত কাঠামো কিভাবে নির্মাণ করেছিল এবং লোকজ ভাবধারাকে কিভাবে সাহিত্যে প্রতিষ্ঠিত করেছিল। লোকসাহিত্যের ধারাবাহিক বিকাশ মধ্যযুগে বাংলা লোকসাহিত্যের চর্চা ছিল অত্যন্ত প্রবল। গ্রামবাংলার প্রতিটি অঞ্চলে আঞ্চলিক ভাষা, উপভাষা এবং রীতি অনুসরণ করে রচিত হত নানা ধরণের পদ, পালা, লোকগান, ভাটিয়ালী, মুর্শিদী, বাউল গান ইত্যাদি। এই সমস্ত সাহিত্য আধুনিক সাহিত্যের মতো কাগজে লেখা হত না, বরং মুখে মুখে প্রচারিত হত। ফলে লেখকের নাম অনেক সময় অজানা থেকে গেলেও সাহিত্যের প্রভাব সুদূরপ্রসারী ছিল। বিশেষত বাউল গান এবং মুর্শিদী গানে জীবনবোধ, আধ্যাত্মিকতা এবং মানবধর্মের এক অপূর্ব সংমিশ্রণ দেখতে পাই। লালন ফকির, দা...

মধ্যযুগ বাংলা সাহিত্যের অন্ধকার যুগ নয় – ৩য় পর্ব: সমাজ, ধর্ম ও সাহিত্যের যোগসূত্র

ছবি
🔍 সমাজ, ধর্ম ও সাহিত্যের পারস্পরিক সম্পর্ক মধ্যযুগীয় বাংলা সাহিত্যের ইতিহাসে ‘অন্ধকার যুগ’ বলে একটি ধারণা প্রচলিত আছে। তবে এই সিরিজের ১ম পর্ব ও ২য় পর্ব ে আমরা দেখেছি, এই ধারণাটি একপেশে ও ভ্রান্ত। এখন আমরা আলোচনা করবো—এই সাহিত্যের সমাজ ও ধর্মীয় প্রেক্ষাপট কীভাবে সাহিত্যকে গভীরতর করেছে। 📖 ধর্মীয় অনুশাসন ও সাহিত্য মধ্যযুগীয় সমাজ ছিল ধর্মনির্ভর। বৌদ্ধ ধর্ম, হিন্দু ধর্ম এবং পরবর্তীতে ইসলামের আগমন সাহিত্যিক সৃষ্টিতে গভীর ছাপ ফেলেছিল। চর্যাপদের বৌদ্ধ সহজিয়া চিন্তাধারা, শাক্ত পদাবলি, বৈষ্ণব পদাবলি, ইসলামী সুফি ভাবনা—সব মিলিয়ে এক বৈচিত্র্যময় ধারার জন্ম দেয়। যেমন, বিদ্যাপতির পদাবলি বৈষ্ণব প্রেম-ভাবনাকে কাব্যে রূপ দিয়েছে, আবার বড়ু চণ্ডীদাস ‘শ্রীকৃষ্ণকীর্তন’-এ সমাজ ও প্রেমের দ্বন্দ্বকে ফুটিয়ে তুলেছেন। 🌾 সমাজ ব্যবস্থা ও সাহিত্য মধ্যযুগে সমাজব্যবস্থা ছিল শ্রেণিভিত্তিক ও সামন্ততান্ত্রিক। কৃষক, শ্রমিক, কায়স্থ, ব্রাহ্মণ থেকে শুরু করে মুসলিম সৈনিক, জমিদার, নবাব ইত্যাদি শ্রেণির অস্তিত্ব সাহিত্যে পাওয়া যায়। এসব শ্রেণির জীবন, সুখ-দুঃখ, ধর্মাচার সাহিত্যের মূল উপজীব্য হয়ে ওঠে। ...